লিখেছেন: মাওলানা সাঈদ আহমদ (আজিমপুরী হুজুর)
০১- কিতাবের নামটি লক্ষ করুন।এতে এ শব্দগুলো বিশেষভাবে খেয়াল করার মত— في شيء من مصطلح الحديث الشريف
অর্থাৎ এই কিতাবে শুধু مصطلحات এর অর্থ-মর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, أحكام ووأصول النقد নিয়ে বহস করা হয়নি।
আসলে أصول الحديث-এর কিতাবসমূহে মৌলিকভাবে দুটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়—
ক. ألفاظ اصطلاحية-এর পারিভাষিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ।এ অংশকে আমরা الجانب الاصطلاحي বলতে পারি।
খ. أصول النقد و قواعده এবং مصطلحات সংশ্লিষ্ট أحكام-এর আলোচনা-পর্যালোচনা।এ অংশকে الجانب التأصيلي و التقعيدي و الحكمي বলা যেতে পারে।
একটি উদাহরণের দ্বারা বিষয়টি আরো পরিষ্কার করা যেতে পারে:
উসুলুল হাদীসের কিতাবসমূহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসিদ্ধ আলোচনা হচ্ছে - بحث المرسل
এতে মূলত দুটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়—
ক. مرسل শব্দের অর্থ কী? এ শব্দ দ্বারা ইমামগণ কী কী অর্থ-মর্ম বোঝান ও প্রকাশ করেন? শব্দটির ব্যবহার কত ধরনের ও কী কী? শব্দটির ব্যবহার প্রসিদ্ধ অর্থেই সীমাবদ্ধ না انقطاع-র অন্যান্য সূরতের জন্যও শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে? ইত্যাদি,ইত্যাদি।
খ. مرسل-র হুকুম কী? الحديث المرسل সহীহ না যয়ীফ? এ ব্যাপারে أقوال أهل العلم কী কী? কার কী দলীল? এখানে যে اختلاف পাওয়া যায় তার دائرة ও منشأ কী? ইত্যাদি,ইত্যাদি।
প্রথম আলোচনাগুলো الجانب الاصطلاحي সম্পর্কিত।আর শেষোক্ত আলোচনাসমূহ الجانب الأصولي والتأصيلي সংশ্লিষ্ট।
তো, الوجيز কিতাবটিতে শুধুমাত্র اصطلاحات-র অর্থ-মর্ম নিয়ে অর্থাৎ الجانب الاصطلاحي সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।এতে أحكام و أصول النقد বিষয়ে আলোচনা করা হয়নি।
সাধারণত উসূলুল হাদীসের কিতাবগুলোতে مصطلحات و أحكام উভয় বিষয়ে একসাথে আলোচনা করা হয়,যা মুবতাদীদের পক্ষে সহজে ফন্ বুঝতে সহায়ক নয়।প্রথমে শুধু الجانب الاصطلاحي নিয়ে আলোচনা করা, অতঃপর مصطلحات-র অর্থ-মর্ম বুঝে ফেলার পর ধীরে ধীরে أحكام এবং أصول النقد و قواعده و ضوابطه সম্পর্কে ধারণা দিতে থাকা— এটাই সহজ,সুন্দর,ফিতরী পদ্ধতি।أصول التعلم والتعليم-এ التدريج বলে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে,এরও দাবী হলো- প্রথমে শুধু اصطلاح পড়িয়ে পরে أصول وأحكام পড়ানো।
হজরাতুল উস্তাদ কিতাবটিতে এ পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন।ভবিষ্যতে কিতাবটি যখন পূর্ণ হবে(মোট চারটি বাব থাকবে), তখন পরবর্তী বাবগুলোতে اصول واحكامও থাকবে।
০২– নামের মধ্যে বলা হয়েছে— في شيء من مصطلح الحديث। এর তাৎপর্য হলো,কিতাবে সকল مصطلحات-র আলোচনা আপাততঃ আসেনি।বরং তার একটি অংশ এসেছে।হুজূর مصطلحات حديثية-কে বড় বড় ১১টি ভাগে ভাগ করেছেন।কিতাবে প্রথম পাঁচ প্রকারের اصطلاحي শব্দাবলির অর্থ-মর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।অন্যান্য শব্দ যেমন ألفاظ الجرح والتعديل ومصطلحاتهما নিয়ে এখনো আলোচনা করা সম্ভব হয়নি।পরবর্তীতে হুজূর করবেন ইনশাআল্লাহ।
০৩– প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় কিতাবের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করত হজরাতুল উস্তাদ লিখেছেন—
۰۰ مبنيا على القواعد الفطرية لشرح المصطلح،ومراعيا لواقع استعمالات الأئمة
অর্থাৎ ফিতরী (স্বাভাবিক,প্রকৃত,যথার্থ) নিয়মানুসারে মুসতালাহগুলোর ব্যাখ্যা করা হয়েছে।ফিতরী নিয়মগুলো কী? মৌলিক একটি কথা হলো- এই মুসতালাহগুলো তো প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়েছে।বহু বহু ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হয়েছে।অতএব মুতাকাদ্দিম ইমামগণ (যারা শব্দগুলোর موجد ও প্রথম ব্যবহারকারী),তাঁদের ব্যবহারিক ময়দানে গিয়ে গভীরভাবে লক্ষ করা যে,শব্দগুলো কী কী অর্থে, কোনভাবে, কত কতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।ইমামের বিভিন্নতায়, ক্ষেত্রের বিভিন্নতায়, যমানার বিভিন্নতায় শব্দের অর্থে বৈচিত্র এসেছে কি না? শব্দটি একক অর্থবিশিষ্ট না একাধিক অর্থবিশিষ্ট? ইত্যাদি।
অতঃপর উক্ত استقراء وتتبع-র আলোকে مصطلحات-র ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা।الوجيز -এ এ তরীকাই অনুসরণ করা হয়েছে।এজন্যই হুজুর যেমনটি বলেছেন,এই কিতাবে التعريفات الرسمية-র উপর জোর দেওয়ার পরিবর্তে واقع استعمالات الأئمة-র প্রতি লক্ষ রেখে আলোচনা করা হয়েছে।
০৪– উক্ত কারণেই কিতাবে শব্দগুলোর অর্থ-মর্ম বয়ান করার সাথে সাথে প্রায় প্রতিটি শব্দের ক্ষেত্রে ইমামগণ বিশেষত মুতাকাদ্দিমগণ ইমামগণের অনেক ব্যবহার দেখানো হয়েছে।ফলে পাঠকের জন্য ইমামদের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করে শব্দগুলোর ব্যবহার স্বচোক্ষে দেখার ও অনুধাবন করা সম্ভব হবে।এতে প্রকৃত ইলমী لذت হাসিল হবে এবং فهم المصطلحات হবে أوقع في النفس
০৫– হুজূর আরো লিখেছেন—
مع نصوص نادرة في الكلمات الأربعة: الحديث،والسنة،والأثر،والخبر
এই চারটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দের ব্যাপারে কিতাবে প্রচুর দুর্লভ نصوص জমা করে দেওয়া হয়েছে।
বস্তুত হজরাতুল উস্তাদ এ চার শব্দের উপর এমন বিস্তারিত, তাহকীকপূর্ণ, সুগভীর ইলমী আলোচনা করেছেন, যা অন্য কোন একক কিতাবে পাওয়া দুষ্কর হবে বলে ধারণা করি।এবং এ আলোচনাটি হযরাতুল উস্তাদের “শানে ইজতিহাদে ভরপুর” আলোচনাগুলোর একটি বলে মনে করি।والله أعلم আর এই শব্দগুলোর সম্পর্ক শুধু علوم الحديث-র সাথে নয়।অন্য একাধিক علوم-এও শব্দগুলোর গভীর প্রভাব রয়েছে,বিশেষত প্রথম দুই শব্দের।এ কারণেই প্রত্যেক তালিবে ইলমের শব্দগুলোর ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরী।এ ব্যাপারে হুজুরের আলোচনাটি খুবই উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।
০৬– পূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে কিতাবে مصطلحات حديثية-কে বড় বড় ১১টি মৌলিক أقسام و أنواع-এ ভাগ করা হয়েছে।এই تقسيم و تنويعও কিতাবের একটি বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ সৌন্দর্য।এতে করে মুসতালাহাতের ব্যাপারে শুরুতেই একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে এবং مصطلحات حديثية কত কত ধরণের ও পর্কারের তার অবগতি লাভ হবে।এই অবগতি فهم المصطلحات فهما صحيحا و دقيقا এর জন্য খুব সহায়ক হবে।
০৭– কিতাবের শুরুতে تاريخ تدوين علم مصطلح الحديث বিষয়ে একটি গভীর আলোচনা রয়েছে।মূল কথাগুলো শাইখ আব্দুল ফাত্তাহ রাহ থেকে নেওয়া হয়েছে।তবে এতে হুজুরেরও একাধিক إضافات مهمة و زيادات مفيدة রয়েছে।বিশেষ করে تدوين علم مصطلح الحديث-এ ফুকাহায়ে কেরাম ও أصحاب أصول الفقه এর যে অবদান, তা হুজুরের আলোচনাতেই স্পষ্ট হয়েছে।
শাইখের এই আলোচনা থেকে শুধু تدوين علم مصطلح الحديث নয়, যে কোন গুরুত্বপূর্ণ علم و فن এর تاريخ تدوين কীভাবে লিখতে হয় তাও অনুধাবন করা যায়।দেখুন- শাইখ এই তারীখ রামাহুরমুযীর কিতাব দ্বারা শুরু করেননি।আরো বহু পূর্ব থেকে,القرن الثاني-র শেষার্ধ থেকে অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী থেকে শুরু করেছেন।আর হুজুর الشواهد العلمية-র আলোকে আরো পূর্বে নিয়ে গিয়েছেন।
০৮– কিতাবে প্রাসঙ্গিকভাবে روايات إسرائيلية সম্পর্কে একটি অত্যন্ত উপকারী ও গভীর তাহকীকী আলোচনা রয়েছে।আলোচনাটি যদিও এক প্রকারের استطراد বরং إسهاب في الاستطراد কিন্তু আমাদের মত তালিবুল ইলমদের জন্য এই استطراد و إسهاب খুবই উপকারী হয়েছে।এতে করে আমরা إسرائيليات-র হুকুম, তার ব্যাপারে করণীয়,مرفوع حكمي থেকে তা আলাদা করার সঠিক ইলমী ضابطة (নিয়ম ও পদ্ধতি) ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত ও স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারবো।হুজুর محاضرات علوم الحديث ও এসব হাদীস নয়-১ এও إسرائيليات সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।তিন কিতাবের আলোচনা একত্র করে পড়লে ও যথাযথভাবে অনুধাবন করলে যে ফায়দা হাসিল হবে তা বলাই বাহুল্য।
০৯– কিতাবের শেষে দীর্ঘ فهرس المحتويات রয়েছে।সূচীটি যত্নের সাথে তৈরি করা হয়েছে।এবং তা এমন বিস্তারিত যে, তার উপর ভালভাবে নজর বুলিয়ে নিলে পুরো কিতাব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ হবে।প্রথমেই এই ধারণা লাভ করে কিতাব পড়া হলে ফায়দা বেশী হবে ইনশাআল্লাহ।সূচীতে একটি শিরোনাম বার বার চোখে পড়বে—
نماذج من استعمال الكلمة في عبارات الأئمة القدامى
এতে করে মুসতালাহের ক্ষেত্রে মুতাকাদ্দিম ইমামগণের ব্যবহার লক্ষ করার গুরুত্ব মনের মধ্যে একদম গেঁথে যাবে।
১০– কিতাবের বহু যায়গায় نخبة الفكر و شرحها-র আলোচনার مناقشة علمية করা হয়েছে এবং সেসবের উপর ملاحظات فنية قوية পেশ করা হয়েছে।তবে তা করা হয়েছে بينة و برهان-র আলোকে এবং অবশ্যই পূর্ণ আদব রক্ষা করে।এসব আলোচনা দ্বারা অনেক ইলমী ফায়দা হবে ইনশাআল্লাহ।বিশেষত نخبة الفكر و شرحها-তে شرح المصطاحات و تفسير الكلمات الحديثية -র ক্ষেত্রে যে ইলমী ও ফন্নী সমস্যাগুলো রয়েছে তার বিষয়ে ধারণা লাভ করা যাবে।
একাধিক অর্থ ও ব্যবহারবিশিষ্ট শব্দকে একটি সুনির্ধারিত অর্থে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, পরস্পর متباين নয় এমন দুই শব্দে نسبة التباين পয়দা করা এবং একটিকে অপরটির قسيم বানিয়ে দেওয়া, অত্যন্ত জটিল ও “পুরতাকাল্লুফ” تعريفات رسمية-র মাধ্যমে مصطلحات حديثية এর ব্যাখ্যা করা— ইত্যাদি বিভিন্ন জটিলতা নুখবাতুল ফিকারে রয়েছে।
একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে— مصطلحات حديثية-র ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানতে চাই।কিছুটা গভীর মুতালাআ কোন্ কিতাব দ্বারা শুরু করা যায়? ইতিপূর্বে এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা জটিলতা অনুভব হতো।এখন ইতমিনানের সাথে الوجيز-র কথা বলা যাবে ইনশাআল্লাহ।
তবে এই কিতাবও সম্পূর্ণ ইলমী কিতাব।তাই শুধুই নিজে নিজে না পড়ে মুবতাদীদের জন্য উত্তম হলো— উলূমুল হাদীসের সাথে ممارست ومزاولت আছে এমন কারো কাছে পড়া।তাহলে ফায়দা পূর্ণ হবে ইনশাআল্লাহ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন