সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

"বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ" ৪র্থ পর্ব (খ) জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় "বিকৃত ইতিহাস"

লিখেছেন----সাঈদ আল মাহদী

ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে সুলতান মাহমুদ গজবীর ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আমাদের জাতীয় সিলেবাসে "মূর্তি সংহারক""মূর্তি বিচূর্ণকারী" "মন্দির বিদ্বেষী "রূপ দেওয়া হয়েছে এই কালজয়ী বীরকে।


অন্য দিকে ভারতে  বিশেষত সোমনাথ মন্দির  আক্রমণের কারণসমূহ  অস্পষ্ট রেখে , শুধু মূর্তি ভাঙার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।
এমন কি আমরা যখন বাবরী মসজিদ  ভাঙা  নিয়ে কথা বলি, তখন রামপন্থী ও বামপন্থীরা সোমনাথ মন্দির ভাঙার বিষয়টি টেনে আনে। দৃঢ়তার সাথে উগ্রহিন্দুদের সমর্থন দেয়।প্রকৃত ইতিহাস না জানার কারণে তাদের দৃঢ়তার সামনে আমাদের কন্ঠস্বর নিচু হয়ে যায়। এক সময় নিজেদের মধ্যে হিনমন্যতা সৃষ্টি হয়, পূর্বপুরুষের ইতিহাস নিয়ে গর্ববোধের পরিবর্তে লজ্জিত হই।আর এই হিনমন্যতা ও লজ্জাবোধ আমাদের মধ্যে সৃষ্ট করাই সাম্রাজ্যবাদীদের "ইতিহাস বিকৃতি"-র মূল লক্ষ্য।যাতে তারা শতভাগ সফল।

ভারত আক্রমণের কারণ:-
"""""""''""""""""""""""'""""""""'''''''''''''''
১/হিন্দু জাতি ঐতিহাসিক ভাবে ধর্ষক,নারী বিদ্বেষী,কুসংস্কারাচ্ছন্ন বললে ভুল হবে না।প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এনায়েত উল্লাহ্ আল-তামাস সোমনাথ আক্রমণের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:-মন্দিরের পুরোহিতরা কথিত ভগবানের করুণা পাওয়ার আশায়,একজন মুসলিম তরুণীকে ধর্ষণ ও বলি দেওয়ার চেষ্টা করে।মুসলিম তরুণী সম্ভ্রম রক্ষার্থে সোমনাথ মন্দিরের কূপে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।এই সংবাদ ইয়ামিনুদ্দাউলা ওয়া আমিনুল মিল্লাহ গজনীর সুলতান মাহমুদ জানতে পেরে হাজারো মাইল অতিক্রম করে সোমনাথ আক্রমণ করেন।

২/জয়পালের আগ্রাসী মনোভাব ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সুলতান ভারত আক্রমণ করেন।সূত্রঃ(শ্রীদাশগুপ্তের ভারত ও ইসলাম - চেপে রাখা ইতিহাস)
৩/ইতোপূর্বে রাজপুতদের সাথে সুলতানের কয়েকটি যুদ্ধ হয়, প্রতিটি যুদ্ধে ওরা পরাজয়  বরণ ও শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু অল্পদিন না যেতেই আবার বিশ্বাঘাতকতা করে।সোমনাথ মন্দির ছিল তাদের অঘোষিত রাজধানি।তারা মনে করত সোমনাথ মন্দির অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী,কেউ তা জয় করতে পারবে না। এ কারণে মন্দিরকে তারা পরামর্শমহল বা জাতীয় সংসদরূপে ব্যবহার করত। এখানে তারা নিজেদের অর্থ সম্পদ গোপন রাখত,এমন কি ইতিহাস থেকে জানতে পারি জলদস্যুরাও তাদের ছিনতাইকৃত সম্পদ গচ্ছিত রাখত।রাজনৈতিক  কারণেই সুলতান, সোমনাথ আক্রমণ করেন।( একই কারণে বাদশাহ আলমগীর ও আক্রমণ করেন)
৪/সোমনাথ মন্দিরে ঝুলন্ত শিব-মূর্তি ছিল, হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল বিশেষ ক্ষমতা বলে ভগবানের মূর্তি শূন্যে অবস্থান করছে।সুলতান প্রকৌশলীর ও ধাতুবিদদের দ্বারা তা পরিক্ষা করান,ফলাফল বের হয় :- "মূর্তি ছিল লোহার আর বেষ্টিত দেয়ালের, ইট ছিল চৌম্বকের।"তাই দেয়ালটি ভেঙে দিতেই মূর্তি আপনা আপনি মাটিতে পরে ভেঙে যায়।এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বেলুন উইলিয়াম হান্টার বলেন:- এক সময় লোকেরা গল্পটি খুব বেশি বিশ্বাস করলেও এখনকার গবেষণায় এটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে যে,মাহমুদ এবং তাঁর মূর্তি ভাঙার গোটা গল্পটাই সাজান।
( চেপে রাখা ইতিহাস)

সোমনাথ শুধু মন্দিরই নয় বরং এটা ছিল রাজপুতদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অলৌকিকতার, ভন্ডামীর কেন্দ্রস্থল।তাই সুলতাম মাহমুদ সোমনাথ আক্রমণ করে রাজপুতদেরকে সবদিক থেকে পরাস্ত করেন।
রয়ে গেলো অর্থের বিষয়টি,
পৃথিবীর শুরুতে থেকে আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে,সবখানেই শারীরিক পরাজয়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ভাবেও শত্রুকে পরাস্ত করা হয়েছে।কিন্তু একমাত্র ইসলামই শত্রুর সম্পদ হস্তক্ষেপের কঠোর নীতিমালা দিয়েছে।শুধু যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর ছেড়ে যাওয়া মাল ব্যতীত অন্য মাল কে গনিমত হিসাবে ঘোষণা দেয়নি।

অভিযোগ খন্ডন:-
সুলতান মাহমুদ গজনভী রহ্ঃএর প্রতি আরেকটি অভিযোগ করা হয়, তিনি সোমনাথ মন্দিরের সম্পদ গজনী ও বাগদাদ নিয়ে যান।(যদিও বহু ঐতিহাসিকরা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।)
যদি মেনেও নিই, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবে:-
১/তিনি কী কারো ঘর-বাড়ি থেকে সম্পদ নিয়ে ছিলেন না যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে?
২/মন্দির বিদ্বেষী হলে ভারতে কতটি মন্দির ধ্বংস করেছেন?
৩/সোমনাথ সমূলে ধ্বংস করলে সেখানে মন্দির থাকে কিভাবে?তা পূননির্মানের ইতিহাসটা একটু বলবেন?

সুতরাং বাবরি মসজিদ বিষয়ে সোমনাথ মন্দির টেনে আনা বোকামী ও সাম্রাজ্যবাদীদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে পরাজয় বরণ  করার বহিঃপ্রকাশ, বৈ কিছু নয়।

কেমন ছিলেন সুলতান মাহমুদ গজনভী? একজন হিন্দু নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের কাছ থেকে জেনে নিই:-
"ইতিহাসে সুলতান মাহমুদের স্থান নির্ধারণ করা কঠিন নয়।সমসাময়িক মুসলমানরা তাঁকে গাজী ও ইসলামী নেতা বলে জানতেন।হিন্দুরা অনেকে আজ পর্যন্ত তাঁকে নিষ্ঠুর,অত্যাচার,আদি হুন এবং মন্দির ও মূর্তি বিণাষকারী বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু যে সে যুগের খবর রাখেন, তাঁর ভিন্ন মত পোষণ আবশ্যক। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের চোখে সুলতান মাহমুদ একজন শ্রেষ্ঠ জননেতা,ন্যায়পরায়ণ সুলতান,সাহসী ও প্রভাবশালী সেনাপতি এবং জ্ঞানবিজ্ঞান শিল্পকলার উৎসাহদাতা ছিলেন।তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা বাদশাহদের আসনে বসার যোগ‍্য। " ড:ঈশ্বরী প্রসদের Mediacval India -১৯১)
[চেপে রাখা ইতিহাস ]

সুলতাম মাহমুদ ছিলেন,
"একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক,ধার্মিক মুসলিম,শশ্রুমন্ডিত সাহসী পুরুষ।তার সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহু অমুসলিম ছিল,ভারত ও সোমনাথ আক্রমণে তারাও শামিল ছিলো।  তাদের উল্লেখ করার বেলায় বর্তমান বিকৃত ইতিহাস নিরব কেন? তিনি ধার্মিক মুসলিম ছিলেন,এটাই তাঁর অপরাধ?

বিবেকানন্দ তার রচিত বইতে লিখেছে, “দেখা যায় ইসলাম যেথায় গিয়েছে, সেথায়ই আদি নিবাসীদের রক্ষা করেছে। সেসব জাতি আজো বর্তমান। তাদের ভাষা, জাতীয়তা আজও বর্তমান।” (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, পৃষ্ঠা ১১৫)
ডক্টর তেজ বাহাদুর সাপ্রু বলেছেন:- “হিন্দুদিগকে রক্ষা করিবার একমাত্র উপায় ইসলাম ধর্মের কতিপয় মূলনীতি- আল্লাহর একত্ববাদ ও মানবের বিশ্বজনীননত্ব।”
আচার্য প্রফুল্ল রায় বলেছে, “জগতের বুকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট ধর্ম। প্রশান্ত মহাসাগর হতে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত সমস্ত মানবমনকে একসূত্রে আবদ্ধ করে ইসলাম পার্থিব উন্নতির চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে।”
মুসলিম জাতি সাতশো বছরের কিছু বেশি সময় ধরে ভারতে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিম জাতি ছাড়া ভারতে আর কোনো সম্প্রদায় এই উন্নতির উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। তর্কের খাতিরে যদি ইংরেজদেরও তুলনার জন্য টেনে আনা হয়, তাহলেও দেখা যাবে- ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৯০ বছর ধরে তারা যে শাসন করেছে এর পেছনে উদ্দেশ্যই ছিল ভারতবর্ষ থেকে লুটপাট করে ইংরেজদের দেশগুলো উন্নত করা। আর করেছেও তাই। কিন্তু শতশত বছর মুসলমানগণ ভারত শাসন করেছেন কেবল ইসলাম ক্বায়িম করার জন্য। মুসলমানদের কারণেই ভারতে আজ হিন্দুরা দেশত্ববোধ, জাতিত্ববোধ শিখেছে।

পরিশেষে বলবো, চাপাবাজ, মস্তিষ্ক বিক্রিকারী কতিপয়  উশৃঙ্খল সাম্রাজ্যবাদী, জঙ্গিদের দৃঢ়তার সামনে আমার কন্ঠ নিচু বা অবদমিত কখনো হবে না।আমাদের ইতিহাস মাথা উঁচু করার ইতিহাস। আমরা কখনো কারো সম্মুখে মাথা নত করিনি।আর কখনো করবো ও না ইনশাআল্লাহ।
**************************************

চোখ রাখুন,আগামী পর্বে।
টিপু সুলতাম-শেষ নবাব
"দূর্গা পূজা "
ভগবানের পূজা নাকি ইংরেজদের গোলামী বরণের পূজা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার বিয়োগে আমরা মর্মাহত, ভারাক্রান্ত হে মহাননেতা!

  এখনো আশাবাদী, ইয়াহইয়া আস সিনওয়ার, হিজড়াঈলিদের সকল প্রোপাগান্ডা মিথ্যা প্রমাণিত করে, আবারো জীবিত ফিরে আসবেন। আর যদি তিনি চিরবিদায় নিয়...