প্রথম পর্ব
লিখেছেন---আশরাফ আলম কাসেমী
যারা বলে ইসলামে গোলাম বাদীর প্রথা কেন? উত্তরের আগে তাদের নিকট একটা প্রশ্ন, গোলাম বাদীর এই প্রথা কখন থেকে অস্তিত্বে এসেছে ? এটির প্রবর্তক কারা? ইসলাম তো গোলাম বাদীর প্রথার সূচনা করেনি।
বরং ইসলামই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যে তদানীন্তন কালে প্রচলিত গোলাম বাদীদের জন্যে একটি ন্যায় , সুষ্ঠু, সুন্দর ব্যবস্থার প্রবর্তন ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। গোলামকে মুক্ত করে দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মুক্তকারীকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বিশাল সাওয়াব ও উত্তম প্রতিদানের।
তাহলে কোথা থেকে উৎপত্তি হলো এই দাস প্রথার? কারা করল? কখন করল?
ইতিহাস তো বলে কোনো ইতিহাসবেত্তাই এর সঠিক সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারেনি।
প্রথাটির ভিত্তি তখনই স্থাপিত হয় যখন থেকে মানব জাতির জীবন যাত্রা শুরু হয়। প্রত্যেক জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়েই এর প্রচলন ছিল। ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, আর্য ও দ্রাবিড় সহ সকল ধর্মবিশ্বাস ও জীবন ব্যবস্থাতেই গোলাম বাদীর প্রথা বিদ্যমান ছিল। সব যুগেই তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হত।
আর ইসলাম পূর্ব সময়ে গোলাম বাদীদের সাথে যে ব্যবহার করা হত তার লৌমহর্ষক বর্ননা কিতাব সমূহের পাতায় পাতায় বিদ্যমান। গোলামদের সাথে পশুর চেয়েও হাজার গুণে বেশী দূর্ব্যবহার করা হত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা হত না। সামান্যতম অপরাধের কারনে প্রহার করতে করতে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিত। একবার কারো গলায় গোলামীর হার পরে গেলে তা থেকে উদ্ধার হওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না। দরিদ্রতার কারনে মা-বাবা নিজ সন্তানকে গোলাম বানিয়ে বিক্রি করে দিত। গোলাম বাদীদের প্রতি চরমভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষন করা হত। দুর্বলদের যে কাউকে ধরে নিয়ে হাঁট-বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হত। পথচারীকে ধরে গোলাম বানিয়ে রাখত। সমাজের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা সহ অসংখ্য অমানবিকতার প্রচলন ছিল।
ইসলামের আবির্ভাবের পর হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই প্রথাকে তাৎক্ষণিকভাবে একেবারেই মিটিয়ে দেওয়া দূরহ ছিল। তাই অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে মানবতার প্রতি দরদী আইনের আলোকে ধীরে ধীরে শিথিলতার দিকে এগিয়ে যায়।
পক্ষান্তরে ইসলাম দুই প্রকার কানূন প্রনয়ণ করে। (১) সালবী তথা সমূলে বিলুপ্ত করে দেয়া। যেমন মূর্তিপূজা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা ইত্যাদি। (২) ইজাবী তথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করে দেয়া। এটি আবার দুই প্রকার। (১) ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করে হারাম সাব্যস্ত করে দেয়া। যেমন মদ জোয়া ইত্যাদি। (২) একেবারেই বিলুপ্ত না করে তাতে শিথিলতা এনে বিশেষ কোনো প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে বহাল রাখা। যেমন গোলাম বাদীর মাসআলা।
ইসলাম এটিকে নিছক পূর্বপ্রচলিত প্রথা হিসেবে রেখেছে। আর এর মধ্যে যত কুসংস্কার, অন্ধকারচ্ছন্নতা ও অমানবিক নির্যাতন, মানবতার বিপর্যয় ছিল সবগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে,গোলাম বাদীদের জন্যে সুষ্ঠু, সুন্দর, সুষম ও ন্যায্য অধিকা নিশ্চিত করেছে।
কোরআন, হাদীসে এ সম্পর্কে অসংখ্য বানী রয়েছে।
মালিক কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তোমরা গোলাম বাদীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো, তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খেতে দাও, যা পরিধান করবে তাদেরও তা পরিধান করতে দাও। গোলামদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তোমরা স্বীয় মনিবদের রব বা প্রভু বলে ঢেকো না। বরং মালিক বলে সম্বোধন করবে। কেননা তোমাদের প্রভু এক আল্লাহ। যিনি তোমাদের ও তোমাদের মালিকদের সৃষ্টিকারী। মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তোমরা অধিনস্তদের গোলাম বাদী বলে সম্বোধন করো না। এটা তাদের জন্য পীড়াদায়ক শব্দ । নিজের ছেলে-মেয়েকে যেভাবে সম্বোধন করো তাদেরকেও সেভাবে সম্বোধন কর। এবং স্বাধীন ব্যাক্তিকে গোলাম বানাতে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ফলশ্রুতিতে দূর-দূরান্তে সফর কালে গোলাম উটের উপর বসে থাকত, আর মনিব উটের লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে চলতেন। যেমনটা অর্ধ জাহানের শাসক হযরত উমর রা. এর জীবনী থেকে পাওয়া যায়।
যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করতেও ইসলাম করেছে এক অভিনব ব্যবস্থার প্রনয়ণ। নামে মাত্র মুক্তিপণ, মুসলিম বন্দিদের মুক্ত করার শর্তে মুক্তিদান, মক্কা থেকে মাদিনায় নবী দুলালীকে প্রেরণের বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া, মুক্তিপণে অক্ষম হলে মুসলিম বাচ্চাদের লেখাপড়া শিখানোর বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, তাতেও সক্ষম না হলে একেকজনকে একেক মুসলমানের হাতে তুলে দেওয়া হত। মুসলমানরা যুদ্ধবন্দীদের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করতেন। নিজেরা খেজুর খেয়ে জীবনধারন করতেন। আর বন্দিদের রুটি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতেন । এসব পন্থা সহ আরও নানান পদ্ধতিতে যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোন জাতী-সম্প্রদায়, ধর্ম-গোষ্টিতে নেই।
একটিমাত্র বিধানের ক্ষেত্রে ইসলামের এত দরদমাখা আচরণ ও সৌন্দর্য জানার পরেও যারা ইসলামের বিকৃতি সাধনের লক্ষ্যে, মুসলমানদেরকে সংশয়পরায়ণ করে তোলার উদ্দেশ্যে, ঈমানহারা করার মানসে, ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের (আরবীতে যাদেরকে মুস্তাশরীকীন বলা হয়) উঠানো প্রশ্নগুলোর নবায়ন করার হীন চেষ্টায় লিপ্ত, আত্মধোকায় নিমজ্জিত। তাদেরও হয়ত খুব ভালো করেই জানা আছে যে, আমরা যাদের ইশারায় চলছি তারা (মুস্তাশরীকীনরা) মুসলমানদের লিখনির জবাবে ঠিকে থাকতে পারেনি। আমরাও পারব না। কিন্তু কিছু ফায়দা তো হবে যে, এসবের মাধ্যমে পকেট গুলো ভারী রাখা যাবে। ফ্রান্স, জাপান, আমেরিকা ইংল্যান্ডের ভিসা পাওয়া যাবে। এটা কি কম(?)
পশ্চিমা ঔপনিবেশিকরা নিজেদের হীন চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নতুন চালে লিপ্ত, যার স্বীকার সংশয়বাদী বা তথাকথিত নাস্তিক্যবাদ। তারা ভাবছে আমরা নিজেদের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছি তাতে কি হয়েছে? এখন মুসলমানদের দ্বারা মুসলমানদেরকে সংশয়বাদী বানাবো। যারা নিজেদেরকে নাস্তিক বলে দাবী করবে।
তাই বলছি আপনারা মুসলমানের সন্তান, আমাদের ভাই, আপনাদের পরিনাম আছে, সে ব্যাপারে সতর্ক হোন। তওবা করে ফিরে আসুন। দুনিয়া আখেরাতের অফুরন্ত নেয়ামতরাজীর অংশীদার হোন। শান্তির সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিন। মহাপরাক্রমশালী সর্বময় ক্ষমতার অধিপতি অতিশয় দয়ালু আল্লাহ তা'আলা তওবাকারীর অতীতের সকল পঙ্কীলতা, যাবতীয় অপরাধ মোছনকারী । তিনি সর্বোত্তম, ক্ষমাশীল।
(বিস্তারিত প্রমানাদি পরবর্তী লিখায় দ্রষ্টব্য ইনশাআল্লাহ )

মাশাআল্লাহ,অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।
উত্তরমুছুন