লিখেছেন----এনামুল হাসান কাসেমী
،نحمدك يا من أنزل علينا القرآن في رمضان وجعله هداية للإنسان، ونصلي على من جعله الله خير الأنام.؛
কিছুদিন পরই পবিত্র রামাযান মাস শুরু হতে যাচ্ছে। এই মাসের ফযীলত আর বরকত সম্পর্কে জানে না, এমন মুসলমান নেই বললেই চলে। আল্লাহ তায়ালা এ মাস তার ইবাদত করার জন্য দান করেছেন। অজানা বহু রহমত আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে এ মাসে দান করেন। যেসব রহমতের কল্পনা আমরা করতেও পারি না।
এই মাসটি কে রামাযান মাস বলা হয় কেন.?
#রামাযান শব্দের অর্থ :- - - - - - - - - - - - - - - - - -
আমরা 'রামাযান' শব্দটির 'মীম' অক্ষর সাকিনের সাথে ভুল উচ্চারণ করে থাকি। সঠিক শব্দ হচ্ছে - 'রামাযান' অর্থাৎ যবরবিশিষ্ট 'মীম' - এর সাথে।
'রামাযান' শব্দটির অর্থ অনেকে অনেক ভাবে করেছেন। মূলত আরবী ভাষায় শব্দটির অর্থ - 'দগ্ধকারী, দাহনকারী, জ্বালানি, ইত্যাদি।
( কামুস, খন্ড ২ পৃষ্ঠা ৪৯০)
ওলামায়ে কেরাম বলেন, মাসটিকে 'রামাযান' নামে আখ্যায়িত করার কারণ হচ্ছে, এ মাসে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রহমত ও ফজলে বান্দার সকল গুনাহ জ্বালিয়ে দগ্ধ করে দেন।
রোযা ফার্সি শব্দ আরবীতে বলা হয় 'সাওম' আর 'সাওম' এর বহু বচন 'সিয়াম'
সাওম-এর আভিধানিক অর্থ :
الصوم لغة الإمساك مطلقاً؛
যেকোন কিছু থেকে বিরত থাকা।
সাওম-এর পারিভাষিক অর্থ :
وفي الشرع هو الإمساك نهاراً عن إدخال شيء عمداً أو خطأ بطنا أو ما له حكم البطن وعن شهوة الفرج بنية من أهله.؛ ( قواعد الفقه)
শরীআতের পরিভাষায়, যার উপর রোজা রাখা ফরয এমন ব্যক্তির রোযার নিয়তে দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে পেটে অথবা শরীরের যে অংশ পেটের হুকুম রাখে ( যেমন, মস্তিষ্ক) তাতে কোন বস্তু দাখিল করা থেকে এবং যৌনাঙ্গের চাহিদা থেকে বিরত থাকাকে সাওম তথা রোজা বলে।
সাধারণ ভাষায় সহজ - সরলভাবে রোযার পরিচয় এভাবে দেওয়া হয় - সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে ইচ্ছাকৃতভাবে পান, আহার ও যৌন তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে রোযা বলা হয়।
কখন রোযা ফরয হয়েছিল :
'' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' " " " "হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে রামাযানের রোযা ফরয হয়। এর পূর্বে রাসূল সাঃ ও সাহাবায়ে কিরাম আশূরা-র রোযা এবং আইয়্যামে বীযের রোযা রাখতেন। হানাফীদের মতে আশূরা-র রোযা তখন ফরয ছিল। তবে শাফিঈদের মতে রামাযানের রোযার পূর্বে অন্য কোনো রোযা ফরয ছিল না।
হানাফীদের মতের পক্ষে আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসকে বিশেষভাবে দলীল হিসাবে পেশ করা যায়।
عن عبد الرحمن بن مسلمة عن عمه إن أسلم أتت النبي صلى الله عليه وسلم فقال: صمتم يومكم هذا ( أي يوم عاشوراء) قالوا لا: قال فأتموا يومكم واقضوه؛ ( رواه أبو داود رقم الحديث ٢٤٤٤)
অর্থাৎ, আসলাম গোত্রের লোকেরা নবী কারিম সঃ এর কাছে আসল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা আজ ( এই আশূরার দিন) রোযা রেখেছে কি? তারা বলল, না। তিনি বললেন, তাহলে অবশিষ্ট দিনটুকু রোযার মত পূর্ণ করে নাও আর এ দিনের রোযার কাযা করে নিও।
( আবু দাউদ হাঃ ২৪৪৪)
এখন 'কাযা' শব্দটি স্পষ্টতই এ দিনের রোযা ফরয ছিল বলে বোঝায়। তবে পরবর্তীতে এই ফরয মানসূখ বা রহিত হয়ে যায়।
রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য :
'' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' ''‘ছিয়াম’ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি।
(মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হাঃ ৪)
ধনী-গরীব সকল প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করা ফরয।
একজন মানুষের সুন্দর ও স্বচ্ছভাবে জীবন যাপনের জন্য যে ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, ছিয়াম তার মধ্যে সে ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে থাকে।
এ মাসে বান্দার জন্য আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করা হয় এবং বান্দার ইবাদতে বাধা প্রদানকারী শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ- وَفِيْ رِوَايَةٍ: فُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِيْنُ- وَفِيْ رِوَايَةٍ: فُتِحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ-
‘যখন রামাযান মাস আগমন করে তখন আসমানের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়। অন্য বর্ণনায় আছে, জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলিত করা হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রহমতের দ্বার সমূহ খুলে দেয়া হয়’।
( মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হাঃ ১৯৫৬)
তিনি আরও বলেন,
إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِّنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِيْنُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ وَفُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ وَيُنَادِيْ مُنَادٍ يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ، وَلِلّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ-
‘যখন রামাযান মাসের প্রথম রাত্রি আসে, তখন শয়তান ও অবাধ্য জিনগুলোকে শৃঙ্খলিত করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়, অতঃপর উহার কোন দরজাই খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা হয়, অতঃপর উহার কোন দরজাই আর বন্ধ করা হয় না। এ মাসে এক আহবানকারী আহবান করতে থাকেন, হে কল্যাণের অভিযাত্রীরা! অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের অভিসারীরা! বিরত হও। আল্লাহ তা‘আলা এই মাসে বহু ব্যক্তিকে জাহান্নাম হ’তে মুক্তি দেন। আর তা (মুক্তি দেয়া) প্রত্যেক রাত্রিতেই হয়ে থাকে’।
( শু-আবুল ঈমান হাঃ ৩৫৯৮)
‘ছিয়াম’ মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
الصِّيَامُ جُنَّةٌ
ছিয়াম ঢাল স্বরূপ’ ( মুত্তাফাক আলাইহি, মেশকাত হাঃ ১৯৪৯)
শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন,
والمراد أنه حجاب وحصن للصائم من المعاصى.
‘ঢাল দ্বারা উদ্দেশ্য হল- ছিয়াম পাপাচার থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ছায়েমের জন্য পর্দা ও রক্ষাকবচ’।
( মেশকাত হাঃ ১৯৪৯, ১/৬১১টিকা)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো ছিয়াম পালনের সময় হবে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় কিংবা তার সাথে লড়াই করে, তাহ’লে সে যেন বলে, আমি ছায়েম’।
( মুত্তাফাক আলাইহি, মেশকাত হাঃ ১৯৫৯)
মানুষের জন্য ছিয়াম পালনের গুরুত্ব রয়েছে বলেই আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদী সহ পূর্ববর্তী উম্মতের জন্যও তা ফরয করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেছেন,
يا أيها الذين آمنوا كتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون.؛
‘হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা মুত্তাক্বী হ’তে পার’ (সূরা বাকারাহ ২/১৮৩)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ‘
তোমাদের মধ্যে যে এ মাসকে পায় সে যেন ছিয়াম রাখে’ (সূরা বাকারাহ ২/১৮৫)
রামাযানের ছিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা প্রতি বছর মুসলমানদের ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এই পরীক্ষায় যখন মানুষ উত্তীর্ণ হয়, তখন তার মধ্যে আল্লাহকে ভয় করার ও যাবতীয় গোনাহ হ’তে বিরত থাকার যোগ্যতা অধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। তখন সে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছুই আল্লাহ জানেন ও দেখেন মনে করে গোপনেও আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে পারে না। যে ব্যক্তি প্রকৃত ছিয়ামপালনকারী সে তীব্র গরমের সময় কলিজা ফেটে যেতে চাইলেও এক ফোটা পানি পান করে না। অসহ্য ক্ষুধার জ্বালায় শরীর দুর্বল হ’লেও সামান্য খাদ্য মুখে দেয় না। এত ত্যাগ, ধৈর্য স্বীকার করে ছিয়াম পালন করা একমাত্র আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে। তাই এর প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ দিবেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَإِنَّهُ لِيْ وَ أَنَا أَجْزِيْ بِهِ.
‘নিশ্চয়ই ছিয়াম আমার জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দিব’।
(মুত্তাফাক আলাইহি, মেশকাত হাঃ ১৯৫৯)
এছাড়াও রামাযানের আরও কিছু গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১-সামগ্রিক কল্যাণ :
'' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' ''
ইসলামে ছিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।
মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানসিক ও শারীরিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে ছিয়ামের প্রভাব অতিশয় কার্যকর ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَأَنْ تَصُوْمُوْا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْن-
‘আর তোমাদের ছিয়াম পালন করা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে,
(সূরা বাকারাহ ২/১৮৪)
২-কুরআন নাযিলের মাস :
'' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' '' ''
পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে এ মাসে ছিয়ামের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‘রামাযান মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে আল-কুরআন। যা মানুষের হেদায়াত এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নির্দেশ ও সত্য- মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং যে ব্যক্তি রামাযান মাস পায় সে যেন ছিয়াম পালন করে’( সূরা বাকারাহ ২/১৮৫)
চলবে,,,,,,

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন